৭৬ বছরের ইতিহাসে বারবার সংকটে আওয়ামী লীগ, বর্তমান পরিস্থিতিকে কেন ভিন্ন বলছেন বিশ্লেষকেরা?
বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে সামরিক শাসন, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, নেতৃত্ব সংকট এবং দমন-পীড়নের মুখোমুখি হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দলটি যে পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, তা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জটিল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে দলটির প্রতিষ্ঠা হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে দলের নাম পরিবর্তন করে ‘আওয়ামী লীগ’ রাখা হয়। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বের মাধ্যমে দলটি পূর্ব বাংলার প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
সামরিক শাসনের প্রথম ধাক্কা
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির পর দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতো আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। দলটির শীর্ষ নেতাদের অনেকেই গ্রেপ্তার হন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এরপরও সাংগঠনিক কার্যক্রম পুরোপুরি থেমে যায়নি।
১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করলে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয়। পরে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাকে অভিযুক্ত করা হলেও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে মামলা প্রত্যাহার করা হয় এবং তিনি মুক্তি পান। ওই সময় আওয়ামী লীগের জনসমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
স্বাধীনতার নেতৃত্ব
১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ায় রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অভিযানের পর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতা অর্জনের পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে এবং শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রনেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৭৫-এর পর সংগঠন টিকিয়ে রাখার লড়াই
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। সামরিক শাসনের সময় দলটির অনেক নেতা কারাগারে যান, কেউ আত্মগোপনে চলে যান এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়।
১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে দলের নেতৃত্ব গ্রহণকে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হয়। এরপর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নিয়ে দলটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধার করে।
ক্ষমতায় ফেরা এবং দীর্ঘ শাসন
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করে। ২০০১ সালে ক্ষমতা হারানোর পর ২০০৯ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। এরপর টানা প্রায় দেড় দশক সরকার পরিচালনা করে দলটি। এই সময়ে অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক বিভিন্ন সূচকে অগ্রগতির পাশাপাশি নির্বাচন ব্যবস্থা, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলে সমালোচনাও ওঠে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের বহু নেতা গ্রেপ্তার হন, অনেকে আত্মগোপনে যান বা দেশের বাইরে অবস্থান নেন। বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয় ও নেতাদের বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। এতে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হয়ে পড়ে।
নিষেধাজ্ঞা ও নিবন্ধন স্থগিত
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।
কেন বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে আওয়ামী লীগ একাধিকবার রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, সামরিক শাসন ও নেতৃত্ব সংকটের মুখে পড়লেও দল হিসেবে তাদের সাংবিধানিক অস্তিত্ব পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম, নিবন্ধন এবং শীর্ষ নেতৃত্ব—তিনটিই একযোগে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
তবে ইতিহাস বলছে, আওয়ামী লীগ অতীতেও একাধিক সংকট অতিক্রম করে রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। বর্তমান পরিস্থিতির পর দলটির ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে বিচারিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক পরিবেশ এবং দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির ওপর।